শফিকরা নৌকায় করে যেতে সবাই নদীর কূলে পৌঁছে গেল। তারা নৌকা থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে শফিকদের বাড়িতে পৌঁছাল। শফিককে দেখে তার বাবা-মা খুশিতে আত্মহারা, কারণ তারা ভাবছিল শফিক মারা গিয়েছে।
ক্ষুদ্রাকৃতির মানুষগুলোকে দেখে তার বাবা-মা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, "এরা কারা?"
শফিক বলল, "ইনি আমার বামুন বন্ধু জুলু মিঞা এবং তাঁর পরিবার।"
সকালবেলা গ্রামের মান্যগণ্য ব্যক্তি এবং মুরব্বীদের নিয়ে সালিশ বসল। গ্রামের সকল মানুষ জড়ো হলো।
শফিক রাগান্বিত কণ্ঠে বলল, "আমাদের পাশের জাতির লোকজন আমাদের ধোঁকা দিয়েছে! আমরা উঁচু জাতির। তারা আসলে নিচু জাতির, কারণ আমাদের আইয়ুবই ছিলেন আসল ইমাম।"
একজন মুরব্বী বলল, "যদি তোমাদের আইয়ুব আসল ইমাম হয়ে থাকেন, তাহলে তোমাদের কাছে একটি সোনার লকেট থাকার কথা। সেটি দেখাও।"
শফিকের বংশের এক লোক রাগান্বিত কণ্ঠে বলল, "আমরা দেখাবো কেন? এত দিন তারা কী লকেট দেখিয়েছে।"
মুরব্বী বলল, না লকেট দেখাতেই হবে। তোমাদের কাছে কী লকেট আছে।
শফিক চিন্তাভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলল, "আছে তো, কিন্তু লকেটটি তো আমি রিয়াকে দিয়ে দিয়েছি।"
এমন সময় রিয়ার মা এসে উচ্চ এবং কান্না জড়িত কন্ঠে শফিককে বলল, "তোর জন্য আমার মেয়ে মারা গেছে! তোর মুখে পক পড়ুক! তুই খুব তাড়াতাড়ি মরবি, শয়তান!"
কথাগুলো শুনে যেন শফিকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে তার পাশের একজনকে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, "রিয়া কি মারা গিয়েছে?"
লোকটি বলল, "হ্যাঁ। সে বিয়ে করবে না বলে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।"
শফিক আর কোনো কথা বলল না। পুরো দুনিয়াটাই যেন তার কাছে থেমে গেছে। সে বাড়িতে গিয়ে তার রুমে শুয়ে পড়ল। সে রিয়ার কথা ভাবছে।চোখের কোণে জল জমেছে।
বিকালবেলা রূপালি এবং তার বাবা-মা আর রূপালির ছোট ভাই বারান্দায় বসে রয়েছে। এমন সময় হঠাৎ করে কোথা থেকে এক খেঁকশিয়াল এসে তার ছোট ভাইকে ধরে নিয়ে যায়।
তারপর তারা সবাই চিৎকার করে উঠল, "ওরে বাবারে! কী হলো!"
এই দৃশ্য দেখে সবাই ভয় পেল। আর তারা সবাই কান্নাই ভেঙ্গে পড়ল।
জুলু মিঞা এবং তার পরিবার এক মুহূর্ত সেখানে থাকতে চাইল না। জুলু মিঞা কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিল। তার শক্তিশালী কন্যা রূপালি ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। রূপালির মা কান্না করছে।
শফিক জুলু মিঞাকে বলল, "কী হয়েছে?"
জুলু মিঞা বলল, "আমাদের যেতে হবে। আমরা তোমাদের সাথে আর থাকতে পারবো না।" শফিক তাদের অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তাদের ভয় ছিল গভীর এবং মনে ছিল শোক।
তারা বলল, "না, আমরা থাকতে পারবো না।"
শফিক বলল, "চলুন, তাহলে আপনাদের আমি এগিয়ে দিই।"
তারপর তারা শফিকের নৌকায় করে এমন এক জায়গার উদ্দেশ্যে রওনা দিল, যেখানে কোনো বড় জীবজন্তুর চিহ্ন পড়েনি।
গভীর রাত। তারা একটি বড় নদী পার হচ্ছে। আকাশে অনেক মেঘ জমেছে। উত্তর দিক থেকে প্রচণ্ড বাতাস বইতে শুরু করেছে। নদীর ঢেউ নৌকাকে আঁচড়ে ফেলছে।
নদীর এক কূলে গিয়ে জুলু মিঞা একজন মানুষকে জিজ্ঞেস করল, "এখানে কি খেঁকশিয়াল আছে?" তার মুখ থেকে কথা শেষ হওয়ার আগেই সে দূর থেকে কুকুর ও শিয়ালের সম্মিলিত ডাক শুনতে পেল। এক লহময় জুলু মিঞা নৌকায় ঝাঁপিয়ে পড়ল।
বাতাস তখন তুফানে পরিণত হয়েছে। ঢেউগুলো ফনিল হয়ে নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার উপক্রম। জুলু মিঞার পরিবার আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে আছে।
জুলু মিঞা সাহস করে উঠে দাঁড়ালো। তার ক্ষুদ্র শরীর যেন এক বিশাল শক্তি ধারণ করেছে। সে কানে হাত দিয়ে এক অদ্ভুত বাউল সুরের মতো গান ধরল:
"ইয়া রাহমানু, উজান নদীর ক্রোধ থামাও,
থামাও ঝড়ো বাতাস, থামাও জলধারার রাগ।
আকাশ জুড়ে শান্তি নিক্ষেপ করো,
আমার দুঃখের ওসিলায় শান্ত করো স্রোতস্বিনী।
ইয়া রাহমানু, উজান নদীর ক্রোধ থামাও।
সাথে সাথে ঝড় থেমে গেল। শফিক বিস্মিত চোখে দেখল—জুলু মিঞার জাদুকরী শক্তি বিশাল প্রকৃতিকে বশ করতে পারে, কিন্তু শিয়ালের ভয় বা মানুষের সমাজে থাকা হিংস্রতার ভয় থেকে তারা মুক্তি পেল না।
এমন সময় শফিক দেখতে পেলো এক আত্মা—রিয়ার আত্মা। তার মায়াবী চোখ দেখে মনে হচ্ছে, সেই এই ঝড়ের উৎপত্তি করেছে। রিয়ার দিকে এক পলকে তাকিয়ে থাকে শফিক। রিয়া মিলিয়ে যায় হাওয়াই।
চলবে….
সিজন ১ এখানেই সমাপ্ত কিন্তু পুরো গল্পটি এখনো শেষ হয়নি। শফিক ও রিয়ার জীবনের না বলা কথা, তাদের গ্রাম ও সমাজের বিস্তারিত বর্ণনা এবং জুলু মিঞাদের সেই রহস্যময় জগত নিয়ে অনেক কিছুই এখনো বলা হয়নি। এই গল্পটির একটি উপন্যাস আনবো ভাবছি। আর শফিকদের খুঁজতে বের হওয়া সেই প্রহরীদের শেষ পর্যন্ত কী হলো, কিংবা সেই রাজ্যের রাজার ছেলের পরিণাম। কিংবা শফিক এবং বামুন জাতিরা শেষ পর্যন্ত কোথায় গেল এই সব কিছু জানতে আমার অন্যান্য গল্প আসলে সেগুলো পড়বেন তাহলে ক্যারেক্টারগুলো সম্পর্কে আরো সব কিছু জানতে পারবেন।
ns216.73.217.110da2


